আশুরা শব্দটি আরবি ‘আশারাহ’ ধাতু থেকে
এসেছে। ‘আশারাহ’ শব্দের অর্থ হলো দশ। দশম
দিবসে আশুরা পালিত হয় বলে একে আশুরা বলে।
আর তা হলো মহররম মাসের দশ তারিখে। কেউ
কেউ মনে করেন, এই দিন আল্লাহ তায়ালা দশজন
নবীকে সম্মানিত করেছিলেন বলে একে আশুরা
নামে অভিহিত করা হয়। আশুরা দিবসটির তাৎপর্য
প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। ইহুদিরা আশুরা
দিবসে রোজা রাখত। কারণ এই দিন নবী মুূসা আ:
ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
মক্কার মুশরিকরাও আশুরা দিবসে সাওম পালন
করত। কারণ তারা দাবি করত তারা ইবরাহিম আ:-
এর অনুসারী। হজরত ইবরাহিম আ: এই দিনে জন্মলাভ
করেছিলেন; এই দিনেই তিনি নমরুদের আগুন থেকে
রক্ষা পেয়েছিলেন। এ ছাড়া আশুরা দিবসে আর
যেসব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছিল তা হলো : এই দিন
আদি পিতা হজরত আদম আ:-এর তওবা কবুল হয়েছিল।
হজরত নূহ আ:-এর জাহাজ তীরে ভিড়েছিল। ঈসা
রুহুল্লাহর জন্ম এই দিনে এবং আকাশে এই দিন
তাকে উত্তোলন করা হয়েছিল। ইউনুস আ:-কে
মাছের পেট থেকে মুক্ত করা হয়েছিল এবং তার
কওমকে আজাব থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। হজরত
ইউসুফ আ:-কে কুয়া থেকে উঠানো হয়েছিল। হজরত
আইয়ুব আ: দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে এই দিন
আরোগ্য লাভ করেছিলেন। হজরত ইদ্রিস আ:-কে
আকাশে উত্তোলন করা হয়েছিল। হজরত সুলায়মান
আ: এই দিন সিংহাসনে আবার অধিষ্ঠিত
হয়েছিলেন।
আশুরা দিবসের ফজিলত : আশুরা দিবসে সাওম
পালনের জন্য রাসূলুল্লাহ সা: নির্দেশ দিয়েছেন।
ফলে ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার সাওম ফরজ
ছিল বলে ধারণা করা হয়। দ্বিতীয় হিজরি সনে
রমজানের সাওম ফরজ হওয়ার বিধান নাজিল হলে
আশুরার সাওম ঐচ্ছিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবুও
তার সওয়াবে কমতি নেই। আবু হুরায়রা রা: থেকে
বর্ণিত, ‘তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন,
রমজানের পর সর্বাধিক উত্তম সিয়াম হলো মহররম
মাসের সিয়াম। আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম
সালাত হলো তাহাজ্জুদের সালাত’ (মুসলিম আস-
সাহিহ, ১ম খণ্ড ৩৫৮)। আরো বর্ণিত আছে, ‘আশুরা
দিবসের সাওম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা:-কে
জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, এর ফলে
আগের বছরের গোনাহ মাফ করে দেয়া
হয়।’ (মুসলিম, প্রাগুক্ত)
আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
জাহিলিয়া যুগে কুরাইশরা আশুরা দিবসে সাওম
পালন করত। রাসূলুল্লাহ সা:-ও সে কালে সাওম
পালন করতেন। মদিনায় এসেও তিনি সাওম পালন
করতেন এবং অন্যদেরও নির্দেশ দিলেন। রমজানের
সাওমের আদেশ নাজিল হলে আশুরা দিবসকে বর্জন
করা হয়। এখন কেউ চাইলে তা পালন করুক আর
চাইলে তা বর্জন করুক। (বুখারি, আস-সাহিহ, ১ম
খণ্ড, পৃ: ২৬৮)।
আশুরা ছিল ইহুদিদের ঈদ দিবস : হজরত আবু মুূসা আল
আশআরি রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আশুরা
দিবসকে ইহুদিরা ঈদ হিসেবে গণ্য করত। নবী করিম
সা: তা দেখে মুসলিমগণকে নির্দেশ দিলেন,
তোমরা এই দিন সাওম পালন করো। (বুখারি,
প্রাগুক্ত)।
আশুরার সাওমের অবস্থান : আশুরা সাওমের
অবস্থান সম্পর্কে খোদ সাহাবায়ে কিরামের যুগে
বিতর্ক জমে উঠেছিল। কেউ একে ওয়াজিব, কেউ
সুন্নত আবার কেউ এর বিপরীত একে হারাম বা
মাকরুহও আখ্যায়িত করেছিলেন। এক হজের মওসুমে
মুআবিয়া রা: বিশেষ করে মদিনার আলেমগণকে
ডেকে বললেন, (কারণ তাদের মধ্যে এর চর্চা ছিল
বেশি) হে মদিনাবাসী, তোমাদের আলেমগণ
কোথায়? আমি রাসূলুল্লাহ সা:-কে বলতে শুনেছি
তিনি এ দিবসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন,
এটি আশুরা দিবস। আল্লাহ এ দিবসের সিয়াম
তোমাদের ওপর ওয়াজিব করেননি। তবে আমি এই
দিনে সাওম পালনকারী কারো ইচ্ছা হলে সাওম
পালন করবে আর কারো ইচ্ছা হলে তা বর্জন
করবে। (বুখারি, প্রাগুক্ত, সাওম অধ্যায়)।
আশুরার দিবস নির্ণয়ে বিতর্ক : আশুরার দিবস
কোনটি এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কিছু
মতানৈক্য রয়েছে। হাদিস শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ
ভাষ্যকার আল্লামা আইনি বলেন, সাহাবায়ে
কেরাম, তাবিয়িন ও তৎপরবর্তীকালের জমহুর
ওলামার মতে, আশুরার দিবস হলো, মহররম মাসের
দশম দিবসে। তবে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা:-এর
মতে, তা হলো নবম দিবসে। কোনো কোনো
সাহাবির মতে, তা হলো মহররমের একাদশ দিবসে
আবু ঈসহাক উপরিউক্ত তিন দিনই সাওম পালন
করতেন। আর বলতেন, আশুরা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা
থেকে আমি এ তিন দিন সাওম পালন করি।
(পাদটিকা সহিহ বুখার, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬৮)।
আশুরার সাথে পূর্ববর্তী বা পরবর্তী দিন সাওম
পালন : বর্ণিত আছে আশুরায় মদিনার ইহুদিদের
সাওম পালন করা দেখে রাসূলুল্লাহ সা: তাদের
কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তারা
বলেছিল এটি একটি পুণ্যময় দিবস। বনু ইসরাইলকে
আল্লাহ তায়ালা এই দিন শত্রুদের কবল থেকে
মুক্তি দিয়েছিলেন। ফলে মুসা আ: এই দিন সাওম
পালন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা: শুনে বললেন,
তোমাদের থেকে আমি মুূসার অনুকরণের উপযুক্ত
বেশি। (বুখারি, প্রাগুক্ত)
তবে হুবহু ইহুদিদের অনুকরণ রাসূলুল্লাহ সা: পছন্দ
করতেন না। তাই তিনি বলেছিলেন, তোমরা আশুরা
দিবসে সাওম পালন করো। সেই সাথে এর আগে এক
দিন অথবা পরে এক দিন সাওম পালন করো। সাওম
পালনে তোমরা ইহুদিদের সাথে সামঞ্জস্য বিধান
করো না। (তাহাবি, শারহু মাআনিল আছার, ১ম খণ্ড,
পৃ. ২৮৬)। এ কারণে আল্লামা ইবনুল আবিদীন শামী
ও ইবনুল হুমামের মতে, শুধু আশুরা দিবসে সাওম
পালন মাকরূহে তানযীহী (ইদাহুল মিশকাত, ২য় খণ্ড
৬৭৭)।
হুসাইন রা:-এর শাহাদাত : আশুরার মহিমা বহু আগ
থেকে চলে আসছে। কিন্তু ইসলামি ইতিহাসের
একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন রা:
কাকতালীয়ভাবে এ মহান দিনে সংঘটিত হয়েছিল।
ঘটনাটি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি মহা
বিষাদ সিন্ধু। আশুরার মহিমাকে এ হৃদয়বিদারক
ঘটনা কালিমাযুক্ত করেছিল। বাতিলের বিরুদ্ধে
আপসকামী না হওয়ায় ইরাকের কারবালা
প্রান্তরে ইমাম হুসাইনকে শির দিতে হয়েছিল। এই
মর্মান্তিক ঘটনা যেন আশুরার মহিমাকে ম্লান
করে দিয়েছিল। আজ অনেকের কাছে আশুরা বলতে
কারবালার এ নির্মম ঘটনাকে বোঝায়। এ যেন মহা
তরঙ্গের নিচে সাধারণ একটি তরঙ্গের হারিয়ে
যাওয়া। আল্লাহর লীলাও বোঝা বড় কঠিন। যে
দিন বিশ্বের মহা প্রতাপশালী জালিম ফিরাউনের
হাত থেকে আল্লাহ তায়ালা সত্য ও ন্যায়ের
প্রতীক মুসা আ:-কে নিষ্কৃতি দিলেন সে দিনই ঘটল
ইসলামের ইতিহাসের এ ঘৃণ্য যবনিকাপাত। ফেরাউন
ও মুসার দ্বন্দ্ব ছিল আল্লাহর রবুবিয়্যাত নিয়ে-
আল্লাহকে স্বীকার করা ও অস্বীকার করা নিয়ে
এ দিকে হুসাইন রা:- এর লড়াই ছিল জালিম শাহির
বিরুদ্ধে। এতে রাজনৈতিক মতবিরোধও ছিল।
কুসংস্কার : আশুরা দিবসে ইয়াজিদকে গালাগাল
করার মধ্যে কোনো সওয়াব নেই। হুসাইনি চেতনা
বহন করার মধ্যে রয়েছে ঈমানি শক্তির উপাদান। এ
উপলক্ষে বিশিষ্ট সাহাবি মুআবিয়া রা:-কেও কিছু
লোক সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
কারণ তিনি ছিলেন ইয়াজিদের পিতা। আমাদের
মনে রাখতে হবে মুআবিয়া রা: ছিলেন একজন
নেতৃস্থানীয় সাহাবি। সাহাবিদের সমালোচনা ও
তাদের গালমন্দ থেকে বিরত থাকতে রাসূলুল্লাহ
সা: স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তাজিয়া মিছিল
করা শিয়াদের একটি অপসংস্কৃতি।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা কারবালা
ও এ ধরনের ঘটনার ব্যাপারে মধ্যপন্থী। অনেককে
দেখা যায়, আশুরা দিবসে সাওমের পরিবর্তে
খিচুড়ি খাওয়ার অনুষ্ঠান করে তা বিলিয়ে দেন।
এটিও সুন্নাহর বিপরীত একটি বদরুসুম।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন