শনিবার, ১১ জুন, ২০১৬

আশুরার ফযিলত


আয়েশা রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমজান
মাসের রোজা ফরজ করার আগে মুসলমানেরা
আশুরার দিন রোজা রাখত। আর এ দিন কাবাঘরের
গিলাফ পরানো হতো। যখন রমজানের রোজা ফরজ
করা হলো তখন রাসূল রা: এ ঘোষণা দিলেন,
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে এ দিনের
রোজা রাখার সে রোজা রাখবে। আর যে রোজা
পরিহার করতে চায় সে তা পরিহার করবে
(বুখারি-১৫১৫, ১৭৯৪)
এ দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করে ইহুদি সমাজও এ
দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করত এবং বিশেষভাবে
এ দিনের রোজাব্রত পালন করত। রাসূল সা: থেকে
প্রসিদ্ধ সাহাবি ইবনে আব্বাস রা: বর্ণনা করেন,
তিনি বলেন, নবী সা: যখন মদিনায় আগমন করেন
তখন তিনি ইহুদিদের দেখতে পেলেন তারা আশুরার
দিবসে সিয়াম পালন করছে, তাদের জিজ্ঞেস
করা হলো; এ দিনের রোজা সম্পর্কে তারা বলল- এ
দিন আল্লাহ তায়ালা মুসা আ: ও বনি ইসরাইলকে
ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের ওপর বিজয় দান
করেছেন, তাই আমরা এ দিনের সম্মান ও মহত্ত্বের
জন্য রোজা পালন করি। তাদের প্রতিউত্তরে রাসূল
সা: এরশাদ করলেন- আমরা তোমাদের চেয়ে মুসার
উত্তম অনুসারী, অতঃপর তিনি এ দিনের রোজা
রাখতে সাহাবিদের নির্দেশ দেন (বুখারি-৩৭২৭)।
আশুরার দিনে রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত
হচ্ছে, রাসূল সা:কে এ দিনের রোজা সম্পর্কে
জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিনের রোজা
পালন গত এক বছরের গুনাহগুলোর
কাফফারাস্বরূপ’ (সহি মুসলিম-১১৬২)।
ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত অপর এক হাদিসে
এসেছে, আশুরার দিবসের রোজা প্রসঙ্গে তাকে
জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার জানা
নেই রাসূল সা: এ দিন ছাড়া অন্য কোনো দিন
ফজিলতের উদ্দেশ্যে রোজা পালন করতেন। আর এ
মাস অর্থাৎ রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে
তিনি রোজা পালন করতেন।’
সহি মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা:
এরশাদ করেছেন, ‘আশুরার দিবসের রোজা পালনে
আমি গত বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে আশা
পোষণ করি’ (সহি মুসলিম-২৮০৩)।
সহি বুখারি ও মুসলিমে সালামাহ ইবনে আকওয়া
রা: হতে বর্ণিত, নবী সা: বনি আসলাম গোত্রের
এক লোককে নির্দেশ দিলেন সে যেন লোকদের
মাঝে এ ঘোষণা করে দেয়, যে আজ সকালে
খেয়েছে সে যেন দিবসের বাকি অংশ রোজা
পালন করে, আর যে ব্যক্তি কিছু খায়নি সে যেন
রোজা রাখে। কেননা আজকের এ দিন আশুরার
দিন।
অপর বর্ণনায় রুবাই বিনতে মু’আওয়ামের সূত্রে
এসেছে, রাসূল সা: আশুরার দিন সকালে মদিনার
আশপাশে আনসারদের গ্রামগুলোতে লোক পাঠিয়ে
এ ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি আজ রোজা
রেখেছে সে রোজা সম্পন্ন করবে, আর যে ব্যক্তি
রোজা রাখেনি সে দিবসের বাকি সময় রোজা
পালন করবে। অতঃপর আমরা এ দিন রোজা
রাখতাম এবং আমাদের ছোট সন্তানদেরও রোজা
রাখতে বাধ্য করতাম।
রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পর রাসূল সা:
আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ তুলে নেন এবং এ
ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করেন। বুখারি ও
মুসলিমে বর্ণিত আছে, ইবনে উমর রা: থেকে
বর্ণিত, নবী সা: আশুরার রোজা রেখেছেন এবং
রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, তবে যখন রমজানের
রোজা ফরজ করা হলো তিনি এ নির্দেশ পরিহার
করেন। তাই আবদুল্লাহ ইবনে উমর তার নির্ধারিত
নফল রোজার দিন না হলে আশুরার এ দিনের
রোজা রাখতেন না।
এসব হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবী
সা: রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার
সিয়াম পালননের নির্দেশ শিথিল করে নেন। এরপর
এ দিনের রোজা বাধ্যতামূলক ছিল না। এ দিনের
রোজা পালন মুস্তাহাব বা সুন্নাতের পর্যায়ে রয়ে
যায়। তার পরও উমর ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আউফ
আবু মূসা, কায়স ইবনে সাদ, ইবনে আব্বাস প্রমুখ
থেকে এ দিনের রোজা রাখা প্রমাণিত হয়।
নবী সা: তাঁর জীবনের শেষ দিকে এ দিনের সাথে
অন্য এক দিনসহ রোজা রাখার সঙ্কল্প করেন।
যেহেতু ইহুদি সম্প্রদায় শুধু এ দিনের রোজা পালন
করে থাকে, তাই তিনি তাদের বিরোধিতা
করণার্থে এ দিনের সাথে আরো এক দিন রোজা
রাখার ইচ্ছা পোষণ করেন। সহি মুসলিমে ইবনে
আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূল
সা: আশুরার দিবসে রোজা রাখলেন এবং এ দিনের
রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন, সাহাবিরা তাকে
জানালেন : হে আল্লাহর রাসূল সা:, এ দিনটিকে
ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা মর্যাদা দিয়ে থাকে। তখন
রাসূল সা: বললেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ আগামী
বছর এলে আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব।
বর্ণনাকারী বলেন, আগামী বছর আসার আগেই
রাসূল সা:-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। অপর এক বর্ণনায়
এসেছে, ইবনে আব্বাস রা: থেকে তিনি বলেন,
রাসূল রা: এরশাদ করেছেন, যদি আমি আগামী বছর
পর্যন্ত বেঁচে থাকি অবশ্যই আশুরার সাথে নবম
দিনও রোজা রাখব।
মুসনাদ ইমাম আহমাদে এসেছে, ইবনে আব্বাস রা:
থেকে বর্ণিত আছে, নবী সা: এরশাদ করেছেন,
আশুরার দিবসে তোমরা রোজা রাখো, আর এ
ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিরোধিতাকারী আশুরার
আগে এক দিন এবং পরে এক দিন রোজা রাখো।
ইবনুল কাইয়্যেম রহ: জাদুল মা’আদ-এ উল্লেখ করেন,
‘আশুরার দিবসের রোজার তিনটি গ্রেড রয়েছে।
সর্বোচ্চ গ্রেড হচ্ছে এর আগে ও পরে মোট তিনটি
রোজা রাখা; তারপর হচ্ছে ৯ ও ১০-এ দুই দিনের
রোজা রাখা। বেশির ভাগ হাদিস এভাবে এসেছে।
এরপর হচ্ছে কেবল ১০ তারিখের রোজা রাখা। এ
বক্তব্য থেকে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ১০
তারিখের রোজা রাখা মাকরুহ নয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন